প্রতিদিন ডিম খাওয়ার উপকারিতা: পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ডিম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর খাবার। ছোট থেকে বড়—প্রায় সব বয়সের মানুষের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখা যায়। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার কিংবা রাতের খাবার—বিভিন্নভাবে ডিম খাওয়া যায়।
অনেকেই প্রতিদিন ডিম খান, আবার কেউ কেউ কোলেস্টেরল বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকেন। আসলে ডিম খাওয়ার পরিমাণ এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে ডিম অনেকের জন্য একটি ভালো পুষ্টির উৎস হতে পারে।
প্রিয় বন্ধুরা, আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব প্রতিদিন ডিম খাওয়ার উপকারিতা, ডিমের পুষ্টিগুণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ডিমের ভূমিকা, প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া যেতে পারে এবং ডিম খাওয়ার সময় কী কী সতর্কতা মেনে চলা উচিত।
ডিমের পুষ্টিগুণ
ডিমকে অনেক সময় পুষ্টির একটি চমৎকার উৎস বলা হয়। একটি ডিমের মধ্যে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে। বিশেষ করে ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম—দুটির মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পুষ্টিগুণ রয়েছে।
ডিমে সাধারণত পাওয়া যায়—
- উচ্চমানের প্রোটিন
- কোলিন
- ফসফরাস
- ফলেট
- সেলেনিয়াম
- আয়রন
- ভিটামিন এ
- ভিটামিন বি১২
- ভিটামিন ডি
- রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি২
- স্বাস্থ্যকর চর্বি
- চোখের জন্য উপকারী লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো উপাদান
একটি সাধারণ আকারের ডিমে প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকতে পারে। এই প্রোটিন শরীরের পেশি, টিস্যু এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গঠন ও মেরামতের কাজে ভূমিকা রাখে।
ডিমের সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো—এটি শুধু প্রোটিনই নয়, একই সঙ্গে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজও সরবরাহ করে। তাই সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে ডিম একটি কার্যকর খাবার হতে পারে।
১. শরীরে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে
আমাদের শরীরের প্রতিদিন কাজ করার জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। হাঁটা, কাজ করা, পড়াশোনা, খেলাধুলা থেকে শুরু করে শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কাজ পরিচালনার জন্যও শক্তি দরকার।
ডিমে থাকা বিভিন্ন বি ভিটামিন শরীরে খাবার থেকে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া ডিমে থাকা প্রোটিন দীর্ঘ সময় শরীরকে তৃপ্ত রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে সকালের নাশতায় ডিম রাখলে অনেকের খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ে। শুধু চা-বিস্কুট বা কম পুষ্টিকর নাশতার পরিবর্তে ডিম, শাকসবজি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবারের সঙ্গে নাশতা করলে খাদ্যের পুষ্টিমান আরও ভালো হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু ডিম খেলেই শরীরে সব ধরনের শক্তির চাহিদা পূরণ হবে না। শরীরের জন্য শর্করা, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজসহ একটি সুষম খাদ্য প্রয়োজন।
২. উচ্চমানের প্রোটিনের ভালো উৎস
ডিমের অন্যতম বড় পুষ্টিগুণ হলো এর উচ্চমানের প্রোটিন। প্রোটিন আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। শরীরের পেশি গঠন, টিস্যু মেরামত এবং বিভিন্ন জৈবিক কাজে প্রোটিনের প্রয়োজন হয়।
শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্রাপ্তবয়স্কদের পেশির স্বাস্থ্য এবং বয়স্কদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমের প্রোটিনে শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে। তাই খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন নিশ্চিত করার জন্য ডিম একটি সহজলভ্য বিকল্প হতে পারে।
যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন বা খেলাধুলা করেন, তাদেরও পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে একজন ব্যক্তির কতটুকু প্রোটিন প্রয়োজন, তা তার বয়স, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্য অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
৩. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে
বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত ওজন একটি সাধারণ সমস্যা। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার কারণে ওজন বাড়তে পারে।
ডিমে প্রোটিন রয়েছে, যা অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের পর তৃপ্তি অনুভব করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে বারবার ক্ষুধা লাগা বা অপ্রয়োজনীয় নাশতা খাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
সকালের নাশতায় ডিম, শাকসবজি এবং অন্যান্য সুষম খাবার রাখা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তবে শুধু ডিম খেলেই ওজন কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন—
- পরিমিত ক্যালরিযুক্ত খাদ্য
- পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম
- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
- পর্যাপ্ত ঘুম
- শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া
- অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো
অর্থাৎ, ডিম একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, কিন্তু একে একমাত্র ওজন কমানোর উপায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।
৪. মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
ডিমে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে কোলিন অন্যতম। কোলিন শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমাদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম ভালো রাখতে সুষম পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিমে থাকা কোলিন সেই পুষ্টির একটি উৎস হতে পারে।
তবে ডিমকে স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর কোনো ওষুধ মনে করা উচিত নয়। ভালো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন—
- পর্যাপ্ত ও সুষম খাবার
- পর্যাপ্ত ঘুম
- নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম
- মানসিকভাবে সক্রিয় থাকা
- ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া
ডিম এসব স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে খাদ্যতালিকায় যোগ করা যেতে পারে।
৫. চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী
চোখ আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামের ক্যারোটিনয়েড পাওয়া যায়, যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদান হিসেবে পরিচিত। এসব উপাদান স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে চোখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ডিমের পাশাপাশি চোখ ভালো রাখতে শাকসবজি, বিশেষ করে সবুজ শাক, রঙিন ফল ও সবজি খাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং চোখের কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে
আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ও সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন হয়।
ডিমে রয়েছে—
- ভিটামিন এ
- ভিটামিন ডি
- ভিটামিন বি১২
- সেলেনিয়াম
এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমর্থন করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু ডিম খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত শাকসবজি, ফল, পর্যাপ্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পর্যাপ্ত পানি এবং ভালো ঘুম শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।
৭. হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্যে সহায়ক
হাড় এবং দাঁত শক্ত রাখতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়ামের ব্যবহার ও শোষণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডিম ভিটামিন ডি-এর একটি খাদ্য উৎস হতে পারে। তাই অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে ডিম খাওয়া হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
তবে শক্ত হাড়ের জন্য শুধু ডিম যথেষ্ট নয়। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিও থাকতে হবে।
দুধ, দই, ছোট মাছ, কিছু শাকসবজি এবং অন্যান্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৮. গর্ভাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস হতে পারে
গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যায়। এই সময় মায়ের স্বাস্থ্য এবং গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিমে থাকা প্রোটিন, কোলিন, ভিটামিন বি১২সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান গর্ভাবস্থার সুষম খাদ্য পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। বিশেষ করে কোলিন ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান।
তবে গর্ভাবস্থায় সবার খাদ্যতালিকা এক রকম হয় না। কোনো গর্ভবতী নারীর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বমির সমস্যা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত অবস্থা থাকলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের তালিকা তৈরি করা উচিত।
ডিম অবশ্যই ভালোভাবে রান্না বা সিদ্ধ করে খাওয়া নিরাপদ খাদ্যাভ্যাসের অংশ।
৯. চুল ও ত্বকের পুষ্টিতে সহায়তা করতে পারে
সুস্থ চুল ও ত্বকের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রয়োজন। ডিমে প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শরীরের সামগ্রিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
চুল মূলত প্রোটিন দিয়ে গঠিত। তাই খাদ্যে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকা চুলের স্বাভাবিক গঠন ও বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিমে থাকা কিছু বি ভিটামিন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু ডিম খেলে চুল পড়া বন্ধ হয়ে যাবে বা নতুন চুল গজাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য কারণ থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চুল পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১০. দীর্ঘ সময় তৃপ্ত থাকতে সাহায্য করতে পারে
অনেকেই খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পর আবার ক্ষুধা অনুভব করেন। বিশেষ করে খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে অনেকের ক্ষেত্রে দ্রুত ক্ষুধা লাগতে পারে।
ডিমে থাকা প্রোটিন তৃপ্তি অনুভব করতে সহায়তা করতে পারে। তাই সকালের নাশতায় বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ডিম রাখলে অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূত হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডিম খেয়ে সারাদিন না খেয়ে থাকা উচিত। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত ও সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে।
ডিমের সঙ্গে রুটি, ভাত, শাকসবজি, ফলমূল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার মিলিয়ে খাবার তৈরি করলে পুষ্টির ভারসাম্য আরও ভালো হয়।
প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া যেতে পারে?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে সবার জন্য একই উত্তর প্রযোজ্য নয়। একজন ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, দৈনিক শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ভর করতে পারে।
অনেক সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি ডিম সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। কেউ কেউ তাদের সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে ভিন্ন পরিমাণে ডিম খেতে পারেন।
যাদের নিচের ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের বিশেষভাবে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা
- হৃদরোগ
- ডায়াবেটিস
- কিডনির কিছু সমস্যা
- বিশেষ খাদ্য নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন
নিজের স্বাস্থ্য অবস্থা বিবেচনা না করে হঠাৎ করে অতিরিক্ত ডিম খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়।
ডিম খাওয়ার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
ডিম স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা উচিত।
১. নষ্ট বা দুর্গন্ধযুক্ত ডিম খাবেন না
ডিমের গন্ধ, রং বা স্বাভাবিক অবস্থায় পরিবর্তন দেখা গেলে সেটি না খাওয়াই ভালো। নষ্ট খাবার খেলে খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি থাকতে পারে।
২. ভালোভাবে রান্না করে খাবেন
কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা ডিমে জীবাণুর ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই ডিম ভালোভাবে সিদ্ধ বা রান্না করে খাওয়া উচিত।
৩. অতিরিক্ত তেল ও মাখন ব্যবহার করবেন না
ডিম নিজে পুষ্টিকর হলেও অতিরিক্ত তেল, মাখন বা উচ্চ চর্বিযুক্ত উপকরণ দিয়ে রান্না করলে খাবারের মোট ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
সিদ্ধ ডিম, পোচ বা কম তেলে তৈরি ডিম অনেকের জন্য তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।
৪. ডিমকে একমাত্র খাবার ভাববেন না
শুধু ডিম খেয়ে শরীরের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় থাকা উচিত—
- শাকসবজি
- ফলমূল
- পর্যাপ্ত প্রোটিন
- শস্যজাতীয় খাবার
- স্বাস্থ্যকর চর্বি
- পর্যাপ্ত পানি
৫. বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে পরামর্শ নিন
আপনার যদি কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তাহলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ডিম কীভাবে স্বাস্থ্যকরভাবে খাবেন?
ডিম খাওয়ার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকরভাবে ডিম খাওয়ার জন্য কয়েকটি সহজ পদ্ধতি হলো—
- সকালে সিদ্ধ ডিম খেতে পারেন
- সবজির সঙ্গে অমলেট তৈরি করতে পারেন
- কম তেলে পোচ তৈরি করতে পারেন
- সালাদের সঙ্গে সিদ্ধ ডিম যোগ করতে পারেন
- ভাত বা রুটির সঙ্গে ডিমের তরকারি খেতে পারেন
ডিমের সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি যোগ করলে খাবারে ফাইবার এবং অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ বাড়ে।
উপসংহার
ডিম আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। এতে থাকা উচ্চমানের প্রোটিন, কোলিন, ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজকে সমর্থন করে।
সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া শরীরে প্রোটিন সরবরাহ, তৃপ্তি বজায় রাখা, মস্তিষ্ক ও চোখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমর্থনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। ডিমে থাকা ভিটামিন ও খনিজ হাড়, দাঁত এবং শরীরের সামগ্রিক পুষ্টি বজায় রাখতেও সহায়ক।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো একটি খাবার একাই সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সুস্থ থাকার জন্য ডিমের পাশাপাশি ফলমূল, শাকসবজি, অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন।
সবার শরীর ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা এক নয়। তাই আপনার যদি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা অন্য কোনো বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তাহলে প্রতিদিন কতটুকু ডিম খাবেন সে বিষয়ে একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
সঠিক পরিমাণে, স্বাস্থ্যকরভাবে এবং সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে ডিম খান—সুস্থ ও পুষ্টিকর জীবনযাপন গড়ে তুলুন।