ঘুম আমাদের শরীর এবং মনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম যদি না হয় তাহলে শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সাথে আমাদের মনোযোগ কমে যায় স্মৃতিশক্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বর্তমান আমাদের ব্যস্ত জীবন এবং অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার আমাদের মানসিক চাপ এবং অনির্মিত জীবনযাত্রার কারণে অনেকেই ভালোভাবে ঘুমাতে পারেন না।
যদি আপনি প্রতিদিন রাতে সহজে ঘুমাতে না পারেন মাঝ রাতে বারবার ঘুম ভেঙ্গে যায় অথবা সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লান্ত অনুভব করেন, তাহলে আজকের এই লেখাটি আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভালো ঘুমের জন্য কি করতে হবে কোন অভ্যাসগুলো বদলানো উচিত এবং কোন কাবার ঘুমের সাহায্য করে সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ভালো ঘুম কেন জরুরী?
ঘুম শুধুমাত্র বিশ্রাম নই, এটা আমাদের শরীর পূর্ণ গঠন প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। ঘুমের সময় শরীর ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করে মস্তিষ্ক দিনের তত্ত্ব গুছিয়ে রাখে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলে।
একটি ভালো ঘুমের উপকারিতা
- মানসিক চাপ কমে
- শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে
- মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে
- ত্বক ভাল থাকে
- ওজন নিয়ত্রন করে
- শরীর শতেজ থাকে
- মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করে
- হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে যায়
একজন মানুষ কত ঘন্টা ঘুমানো উচিত
- প্রাপ্তবয়স্ক৭-৯ ঘন্টা
- শিশু ৮-১০ ঘন্টা
- স্কুলগামী শিশু ৯-১২ ঘন্টা
- ছোট শিশু ১০-১৪ ঘন্টা
শুধুমাত্র ঘুমের সময় নয় ঘুমের গুণগত মান এবং ঘুমের মান সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
ভালো ঘুমের জন্য কয়েকটি কার্যকর উপায় আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমান এবং জেগে উঠুন
শরীরের একটি প্রাকৃতিক গড়ে রয়েছে ওই সময়ে ঘুমাতে গেলে শরীর সেই সময়ের সঙ্গে গড়ে তুলে এবং সেই সময় হওয়া মাত্রই সহজেই ঘুম চলে আসে। তাই ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে উঠার চেষ্টা করতে হবে।
মোবাইল কম ব্যবহার করুন
যখন আপনি ঘুমাতে যাবেন তার আগে মোবাইল টেপ অথবা ল্যাপটপের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার কারনে আমাদের ঘুম আসছে দেরি করে। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে এসব স্কিন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
প্রতিনিয়ত ব্যায়াম করতে হবে যদি আপনি প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাটা অথবা যোগ ব্যায়াম অথবা অত বাহাল কা ব্যায়াম করেন তাহলে আপনার ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করবে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে বাড়িবে না করাই ভালো। প্রতিদিন সকালে অথবা বিকেলে আপনি ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা চেষ্টা করবেন।
রাতে হালকা খাবার খান
আপনি অতিরিক্ত তেল চর্বিযুক্ত অথবা ঝাল খাবার খেলে ওজনের সমস্যা করতে পারেন সমস্যা হতে পারে রাতে হালকা এবং সহজ নিতে হবে
রুমের পরিবেশ ঠিক করুন
ঘুমের জন্য পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যদি আপনার শোবার ঘর আরামদায়িক হয় তাহলে আপনি আরামে ঘুমাতে পারবেন এবং তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে। আপনার ঘুমের ঘরটি যেভাবে রাখবেন।
- ঘর পরিষ্কার করে রাখবেন
- ঘরে আলু কম রাখবেন
- অতিরিক্ত শব্দ দূষণ এড়িয়ে চলুন
- আরামদায়ক বালিশ ও বিছানা ব্যবহার করুন
- ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখুন
মানসিক চাপ কমাতে হবে
দুশ্চিন্তা ও ঊর্ধ্বে ঘুমের জন্য অন্যতম একটি বড় সূত্র ঘুমানোর আগে চেষ্টা করবেন এই সমস্যাগুলো দূর করার
- যেভাবে দূর করবেন
- মেডিটেশন করবেন
- হালকা বই পড়া
- গভীর শ্বাস নেবেন
- দোয়া প্রার্থনা করবেন
- ইসলামিক আমল চর্চা করবেন
দিনের বেলা কম ঘুমাবেন
আমরা অনেকেই রয়েছি দিনে যখন সময় পাই তখনই ঘুমাই। যদি আপনার কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় থাকে তারপরও বেশি সময় না ঘুমানোর পরামর্শ রইলো। কারন আপনি যদি দুপুরবেলা বেশি সময় ঘুমান তাহলে রাতে আপনার ঘুমের সমস্যা হতে পারে
ঘুমানোর আগে গোসল
আমরা অনেকেই ঘুমাতে যাওয়ার আগে গরম পানি দিয়ে গোসল করি । এতে করে আমাদের শরীর ও বেশি শিথিল হয় এবং দ্রুত ঘুম আসতে পারে।
প্রতিদিন রোদে কিছু সময় খাটাবেন
সকালবেলা যদি আপনি রোদে কিছু সময় কাটান তাহলে আপনার শরীরে ভিটামিন এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। সূর্য আমাদের শরীরে রাখলে প্রাকৃতিক ঘুম জাগরণ চক্র ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
ধূমপান থেকে বিরত থাকবেন
ধূমপান সহ এরকম কিছু খাবার ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট করতে পারে। তাই এগুলা খাওয়া বন্ধ করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন গড়ে তুলুন
ঘুমানোর আগে বাড়ি আলোচনা এবং কাজ এড়িয়ে চলুন
অনেক সময় আমরা ঘুমাতে যাওয়ার আগে লম্বা সময় নিয়ে বাড়ি আলোচনা , অফিস আদালত কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তবে ঘুমানোর আগে এসব বাড়ি কাজ গুলো আপনার মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এমন কাজ করা যাবে না। ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করবেন
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি খেতে হবে
দিনে আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি খেতে হবে তবে ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত পানি পান করলে রাতে বারবার বাথরুমে যেতে হতে পারে আর আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ চারা ওষুধ খাওয়া
কখনো আপনি এই বলটি করবেন না কারণ একজন চিকিৎসক আপনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করার পর আপনাকে ওষুধ দেয়। অনেকে দ্রুত ঘুমানোর জন্য ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু যদি এটা দীর্ঘদিন ব্যবহার করেন তাহলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যদি আপনার মনে হয় ঘুমের ওষুধ প্রয়োজন তাহলে অবশ্যই একজন ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করবেন।
ভালো ঘুমের জন্য উপকারী কিছু খাবার
এমন কিছু খাবার রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে আমাদেরকে ঘুমে সাহায্য করতে পারে। তাই আমাদের সবার উচিত সম্ভব হলে এই খাবারগুলো খাওয়া
- কলা
- দুধ
- টক দই
- ওটস
- কাঠ বাদাম
- কোমড়ো বীজ
- আখরোট
- কিউই
- পরিমাণ মতো ভাত
যেসব খারাপ অভ্যাস ঘুম নষ্ট করে দিবে আপনার
- গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার করলে
- অনিয়মিত জীবন যাপন করলে
- ক্যাফেইন অতিরিক্ত খেলে
- মানসিক চাপ থাকলে
- ঘুমের আগে বাড়ি খাবার খেলে
- মোবাইলে দীর্ঘ সময় গেম খেলা হলে
- অথবা দিনে বেশি পরিমাণ ঘুমালে
ভালো ঘুম না হলে কী কী সমস্যা হতে পারে
যদি আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ গুণ না হয় তাহলে আমাদের শরীরে অনেক রোগের প্রভাব পড়ে। যা আমাদের পরবর্তী জীবনকে ক্লান্ত করে দিতে পারে। ঘুম কম হলে কোন সমস্যায় পড়তে পারেন তা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে
- উদ্যোগ ও বিষন্নতায় বকবেন
- হৃদরোগ সমস্যা হবে
- ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যাবে
- ওজন বাড়বে
- উচ্চ রক্তচাপ সমস্যা হবে
- মনোযোগের ঘাটতি হতে পারে
- স্মৃতিশক্তি কমে যাবে
- মাথাব্যাথা হবে
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন
যদি আপনার দীর্ঘদিন ধরে ঘুম কম হয় এরকম সমস্যা থাকে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- তিন সপ্তাহের বেশি ঘুমের সমস্যা হলে
- ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এরকম হলে
- নাক ডাকা সমস্যা হলে
- ঘুমের কারণে দৈনন্দিন কাজ সমস্যা হলে
- সারাদিন অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব
- ঘুমের মধ্যেই বারবার জেগে ওঠা
যদি আপনার এই সমস্যাগুলো মনে করেন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাবেন।
ভালো ঘুমের জন্য একটি সহজ রুটিন
- রাত ৮.৩০ থেকে ৯ ঘটিকায় হালকা রাতের খাবার
- রাত ৯ টা ৩০ মিনিট হতে মোবাইল ও ল্যাপটপ ব্যবহার বন্ধ করুন
- রাত ৯ টা ৪৫ মিনিটে একটু হাটা অথবা হালকা ট্রেচিং করুন
- রাত ১০ টা থেকে বই পড়া অথবা মেডিটেশন অথবা দুয়া দুরুদ পড়ুন
- রাত ১০.৩০ মিনিটে ঘরের আলো কমিয়ে দিন
- রাত ১১ টায় ঘুমিয়ে পড়ুন
উপসংহার :-
ভালো ঘুম কোন বিলাসিতা নয় বরং এটি আপনার সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করবেন স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া নিয়মিত ব্যায়াম করা মানুষের চাপ নিয়ন্ত্রণ রেখে ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত করবেন। যদি এসব অভ্যাস পরিবর্তে থাকে তাহলে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
